২০ আগস্ট ২০১৭, রবিবার

তৃণমূলে কম সুদে গৃহঋণ দেবে আইপিডিসি

দেশের ব্যক্তি খাতের প্রথম আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইপিডিসি ফাইন্যান্স শিল্প, বাণিজ্যিক এবং শিক্ষা খাতের উন্নয়নে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। শুরুতে এর শেয়ারহোল্ডার প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল-আইএফসি; জার্মান ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কম্পানি (ডিইজি), দি আগাখান ফান্ড ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (একেএফইডি), সুইজারল্যান্ড; কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (সিডিসি), ইউকে এবং বাংলাদেশ সরকার। তবে বর্তমানে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক আইপিডিসি ফাইন্যান্সের একটি বড় শেয়ারহোল্ডার। ব্র্যাকের যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাইলে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের এমডি ও সিইও মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আইপিডিসির বেশির ভাগ শেয়ারের মালিক ছিল আগা খান ফান্ড ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট। ব্র্যাকের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে আগা খান ফাউন্ডেশন তাদের শেয়ার ব্র্যাককে হস্তান্তর করে। ব্র্যাককে সঙ্গে নিয়ে আমরা পাঁচ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করি। এভাবেই শুরু হলো আমাদের পুনর্যাত্রা। ‘

বাংলাদেশের অনেকগুলো খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠানের শুরু হয়েছে আইপিডিসির অর্থায়নে। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্বপ্ন আইপিডিসি আবার তাঁর আইকনিক স্ট্যাটাস পুনরুদ্ধার করুক। নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে আইপিডিসি ফাইন্যান্স নতুন রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছে। আইপিডিসির কৌশলগত পরিকল্পনার মধ্যে অগ্রাধিকার খাত সম্পর্কে জানতে চাইলে মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনার প্রথম কথাই হচ্ছে গৃহঋণকে সবার সামর্থ্যের মধ্যে আনা।

”দ্বিতীয়ত, নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করা। নারীরা কোনো আমানত রাখলে আমরা সুদের হার বাড়িয়ে দিচ্ছি। গৃহঋণ নেওয়ার সময় বাড়িটা স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রেশন করলে কম সুদে ঋণ দিচ্ছি। নারী কোনো গাড়ির ঋণ নিলে তাদের ফ্রি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমরা তরুণ ও নারী ফোকাসড ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে চেষ্টা করছি। তৃতীয়ত, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা। আমরা ২০২০ সালের মধ্যে দুই হাজার নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণসহায়তা দেব। সে ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্ব দেব নারীদের। চতুর্থত, মেট্রোপলিটন শহরের বাইরে প্রসার ঘটানো। পঞ্চমত, গৃহসজ্জায় অর্থায়ন। ‘

সবচেয়ে বিশ্বস্ত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে আইপিডিসি ফাইন্যান্স ‘জাগো উচ্ছ্বাসে’ নামে একটি নতুন থিম উন্মোচন করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির নতুন করে যাত্রার কথা বলে। রিব্র্যান্ডিংয়ের পর আইপিডিসি ফাইন্যান্সের অগ্রগতি খুব ভালো বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের শেষে আমাদের ৬০০ কোটি টাকার ঋণ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ২০০০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। তিন গুণের বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে আমাদের। ২০১৭ সালের জুনে তা ৩০০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আমাদের ডিপোজিটে আরো বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরের সঙ্গে এ বছরের জুন পর্যন্ত তুলনা করলে আমাদের মুনাফা প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে। ‘

দুই হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনার ল্যাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইপিডিসি। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে যেসব খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে সেখানে আইপিডিসি যুক্ত হবে জানিয়ে মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গৃহ নির্মাণের বিকাশ মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। শহরতলিতে গেলেই চোখে পড়বে, অসংখ্য পড়ে থাকা অর্ধনির্মিত বাড়িঘর। তাদের পুরো বাড়ি নির্মাণের টাকা নেই। আমরা এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে কম সুদে ঋণ দিয়ে বাড়ি বানানোর সুযোগ করে দেব। ১০ লাখ টাকা দিয়ে মফস্বলে একটা সুন্দর বাড়ি বানানো যায়। একজন মফস্বলের মানুষকে ১০ লাখ টাকা ঋণ দিলে তিনি একবারেই বাড়ি বানিয়ে ফেলতে পারেন। ‘

এ জন্য রড এবং সিমেন্টসহ সংশ্লিষ্ট কম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবে আইপিডিসি ফাইন্যান্স। আইপিডিসির নিজস্ব কার্যালয়ের পাশাপাশি দেশজুড়ে ব্র্যাকের মাধ্যমেও গৃহঋণের তথ্য প্রদান ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করবে আইপিডিসি। চলতি এই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত ৪০টি জেলাতে গৃহঋণ নিয়ে প্রচারণা চালাবে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনমান উন্নয়নে আইপিডিসি অবদান রেখে যাবে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘একটা ভালো বাড়ি জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম অংশ। বাংলাদেশে এক কোটি পরিবার আছে যাদের মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকার ওপরে। এই সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। গৃহায়ণের জন্য এই দুই কোটি পরিবারের গড়ে আড়াই শতাংশ (৫ লাখ) মানুষকেও যদি আমরা ২০ লাখ টাকা ঋণ দিতে পারি তাহলে অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়াবে এক লাখ কোটি টাকা। ‘

‘আমরা গাড়িতে বেশি ঋণ দিতে পারতাম, কিন্তু তা করিনি। আমরা শহরের বড় ঋণগ্রহিতা যাদের কোটি কোটি টাকা ফ্ল্যাটে ঋণ দেই, এদের সংখ্যা মাত্র ১০-১২ লাখের মতো। কিন্তু আমরা যাদের কথা ভাবছি তাদের সংখ্যা দুই কোটি হবে। ২৬টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাদের গৃহঋণ দেয় তারা মূলত  ঢাকা চট্টগ্রামনির্ভর। ঢাকার বাইরেও একটা সুন্দর বাড়ি করা সম্ভব। এটা এখনো খুব পরিকল্পিতভাবে কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান করছে না। ‘

বর্তমানে আইপিডিসির শাখার সংখ্যা ১২টি। এ বছর আরো চারটি এবং আগামী বছর আরো ১৫টির মতো শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। আইপিডিসির সিইও বলেন, ‘আমাদের সম্প্রসারণ করার ইচ্ছা ঢাকার বাইরে। বাংলাদেশ ব্যাংক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক নানা নীতিমালা গ্রহণ করছে। এই কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদের আরো বেশি তৃণমূলে যেতে হবে। আমরা ভালো প্রবৃদ্ধি করছি কিন্তু তার সুফল সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারছে না। আইপিডিসি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি জোগাবে। ‘

খুব কম সময়েই আইপিডিসির কলেবর বেড়েছে তিন গুণ, মন্দঋণ নেমেছে শূন্যের কোটায়। প্রতিষ্ঠানটির শ্রেণীকৃত ঋণ ৪৩ শতাংশ থেকে কমে এখন মাত্র ০.৪১ শতাংশে নেমেছে। আইপিডিসির আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)। এসএমই ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে স্বল্প সুদে অর্থায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনরার্থয়ন তহবিল ব্যবহারের জন্য সম্প্রতি চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০২০ সালের মধ্যে ১০ হাজার নারীকে ক্ষমতায়িত করতে চায় আইপিডিসি। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘আমরা নারীদের জন্য কম সুদে ঋণের পাশাপাশি ডিপোজিটে বেশি ইন্টারেস্ট দিচ্ছি। গৃহঋণের ক্ষেত্রে বাড়ি গৃহকর্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি করলে ইন্টারেস্ট রেট কম হবে। গাড়ির ঋণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা নারী হলে তার জন্য ফ্রি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। ব্যবসায় নতুন নতুন ধারণা নিয়ে যেসব নারী উদ্যোক্তা এগিয়ে যেতে চায় আমরা তাদের মূলধন দেব ব্যবসায় সহযোগিতা করার জন্য। ‘

মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এমনভাবে এগোব যাতে ২০২০ সালের মধ্যে আমরা সেরা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে পারি। এরপর আমাদের টার্গেট থাকবে পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। ‘

ভারতের এইচডিএফসির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবছর ৭০ হাজার কোটি টাকা গ্রহঋণ দেয় এইচডিএফসি। আমরা তাদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিচ্ছি। আমরা চাচ্ছি গৃহঋণ, নারীর ক্ষমতায়ন, এসএমই, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, সাপ্লাই ফাইন্যান্স এবং উদ্ভাবনী বড় প্রকল্পে একটা বিশেষায়িত জায়গায় যাওয়ার। এ ছাড়া আমরা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় গুরুত্ব দিচ্ছি।

বৈশ্বিকভাবে ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তারা স্থানীয় উৎস থেকে অর্থায়নে ঝুঁকবে বলে মনে করেন এই অভিজ্ঞ ব্যাংকার। তাঁর মতে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগ আরো বাড়বে। অর্থনীতিতে খুব সত্বর বড় চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে হয় না। তবে প্রবৃদ্ধি যেভাবে হচ্ছে সেভাবে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। কর্মসংস্থান বিহীন প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য সুখকর নয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে এমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন করতে চায় আইপিডিসি।

দেশের অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মধ্যম আয়ে যাওয়ার আমাদের আরো দক্ষতা প্রয়োজন। ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও কম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো। কারণ বাংলাদেশের মতো প্রতিবছর ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এমন বাজার খুব কম আছে। আমাদের দেশে যারা ব্যবসা করছে তারা সবাই মুনাফা করছে। বিএটি, বার্জার, নেসলে, জিএসকে, গ্রামীণফোন, ইউনিলিভারসহ দেশে বিদেশি কম্পানিগুলো ভালো মুনাফা করছে। কিন্তু আমাদের কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব রয়েছে। আমাদের এয়ারপোর্টে যখন কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী নামেন তখন তিনি এখানকার ব্যবস্থাপনা দেখে হতাশ হন। আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতাটা আরো ভালো করতে হবে, আন্তর্জাতিকভাবে আরো ব্র্যান্ডিং করতে হবে। ‘

You must be logged in to post a comment Login



মতামত

প্রতিদিনের সর্বশেষ সংবাদ পেতে

আপনার ই-মেইল দিন

Delivered by FeedBurner