ঢাকা, সোমবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আয়করে নজর দেওয়া উচিত ছিল, ভ্যাটে নয়

প্রথমবার্তা ডেস্ক, রিপোর্টঃ        নতুন বাজেটের আকার আগের মূল বাজেটের চেয়ে ১৭ শতাংশ বড়। এটা সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশ উচ্চাভিলাষী আকার। তবে সবকিছু নির্ভর করবে বাজেট কতটুকু বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর। আমরা বাস্তবায়ন পর্যায়ে বরাবরই একটা দুর্বলতা লক্ষ করে আসছি।

নতুন বাজেটের বড় অংশ চলে যাবে অনুন্নয়ন ব্যয়, তথা সরকারি বেতন–ভাতা ও অন্যান্য খাতে। উন্নয়ন বাজেটে অবকাঠামো খাতে আরেকটু বেশি বরাদ্দ থাকলে ভালো হতো। এ খাতে মোট উৎপাদনের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।

ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা বিগত বছরগুলোতে পর্যায়ক্রমে কমে এসেছিল। এবার যেহেতু বাজেটের আকার অনেক বড় করা হয়েছে, তাই দেখছি বিদেশি উৎসের ওপর আগের চেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

এটা কত দূর কী হবে বলা মুশকিল। বিদেশি সহায়তা যেহেতু প্রকল্পের জন্য আসে, তাই বাস্তবায়ন না করতে পারলে ফেরত যায়। অতীতে দেখা গেছে, অনেক বিদেশি অর্থ ফেরত গেছে। শর্ত অনুযায়ী আমরা খরচ করতে পারিনি, কারণ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে আরও জোর দিতে হবে।

তিন–চার বছর ধরে বিদেশি সংস্থা, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের শীতল সম্পর্ক ছিল। তা কিন্তু এখন ভালো অবস্থায় আছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এখন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে চাইছে। জাপানের সহযোগিতা সংস্থা জাইকা যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগে অনেক আগ্রহী। ফলে বিদেশি সহায়তা আমরা আগের চেয়ে বেশি আশা করতে পারি।

নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইন নিয়ে আমরা হতাশ। কারণ, আমরা বলেছিলাম ভ্যাটের হার কমপক্ষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। কিন্তু সেটা করা হয়নি, ১৫ শতাংশই রাখা হয়েছে। এতে দ্রব্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়বে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আঘাতপ্রাপ্ত হবেন। এখনো যেহেতু সময় আছে, আমি আশা করব এটি পুনর্বিবেচনা করা হবে।

রাজস্ব আহরণে নজর দেওয়া উচিত ছিল আয়করের ওপর। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভ্যাটের ওপর ভরসা করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, মূল্যস্ফীতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা পরে দেখা যাবে।

আমরা সব সময় বলে আসছি, আয়করের আওতা বাড়াতে হবে। কিন্তু প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে না পারায় পরোক্ষ করের ওপর চাপ বাড়ছে। এটা কাম্য নয়। আমি আশা করব, সরকার এখান থেকে সরে এসে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেবে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেটের আগে করপোরেট কর হার কমানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেটা কমাননি। করপোরেট কর হার বাংলাদেশে বেশি। আমরা আশা করেছিলাম, এটা কমবে। আমরা আবার বলতে চাই, এটা কমানো হোক। এটা যেন পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ও অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ করা হয়।

তৈরি পোশাক খাতের ওপর উৎসে কর আরোপের কোনো সুযোগই নেই। ১০-১৫ বছর ধরে এ খাতে আমরা যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছিলাম তা কিন্তু শ্লথ হয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য খুবই চিন্তার বিষয়। প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি না হলে আমরা কিন্তু পোশাক খাতে ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারব না। আমাদের রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেছে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমরা পারছি না।

নতুন করে উৎসে কর বাড়ালে সমগ্র রপ্তানি খাতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এখানে আরেকটা বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে যে, প্রতিযোগী অনেক দেশ তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছে। বিপরীতে টাকার মূল্য আমরা ধরে রেখেছি। এতেও রপ্তানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমি মনে করি, টাকার অবমূল্যায়ন দরকার।

ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের ওপর যে আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা দেখেছি, বেসরকারি ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের ফি, মাশুল কেটে রাখে। অনেক গোপন মাশুলও। এসবের আঘাতে গ্রাহকেরা জর্জরিত। তারপর এখন আবার আবগারি শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। এটা সাধারণ মানুষের প্রতি কী ধরনের বিচার হলো, সেটা আমি বুঝতে পারছি না।

Translate »