০৩ জুন ২০১৭, শনিবার

ইকবাল ফিরেছেন, সবাই ফেরে না!

Loading...

সাত মাস ধরে ছেলের খোঁজ নেই। এই অবস্থায় একদিন রাত সাড়ে ১১টায় সেই ছেলে যদি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে, তখন একজন বাবার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে! তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে ছেলে ফিরে এসেছেন। ‘ছেলে ফিরে এসেছে, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর নেই। এটা আমাদের পরিবারের জন্য বড় আনন্দ। আমরা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।’ বাবা এ কে এম নুরুল আলমের মনের অবস্থা বা তাঁদের পরিবারের প্রতিক্রিয়াটি আমরা অনুমান করতে পারি।

 

 

 

 

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইকবাল মাহমুদ এই দীর্ঘ সময় কোথায় ছিলেন, কেউ জানে না। তবে একটি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ক্লু আছে। যেদিন ইকবাল নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেই রাতের একটি সিসি টিভির ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে, ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে রয়েল কোচ নামে একটি বাস থেকে নামেন ইকবাল।

নামার পরপরই সাত-আটজন লোক তাঁকে জোরজবরদস্তি করে একটি মাইক্রোবাসে ওঠায়। সিসি ক্যামেরায় সেই মাইক্রোবাসের কাছাকাছি ‘পুলিশ’ লেখা একটি গাড়িও দেখা গেছে। শুরু থেকেই এটা পরিষ্কার ছিল যে ‘নিখোঁজ’ এই চিকিৎসা কর্মকর্তাকে কোনো একটি গোষ্ঠী অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল।

এরপর এই পরিবারের শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। আসুন, আমরা একটু ভাবার চেষ্টা করি এই পরিবারটির গত সাত মাস কীভাবে গেছে! কীভাবে সময় কেটেছে ইকবাল মাহমুদের চিকিৎসক স্ত্রী ও তাঁর দুই সন্তানের। ইকবালকে ফিরে পাওয়ার আশা নিশ্চয়ই তাঁর পরিবার ছাড়েনি।

চেষ্টারও ত্রুটি করেননি তাঁর বাবা। ধানমন্ডি থানায় মামলা করেছেন, সংবাদ সম্মেলন করে ছেলেকে ফেরত চেয়েছেন। কিন্তু আগে একই কায়দায় নিখোঁজ হয়েছেন কিন্তু আর ফিরে আসেননি—এমন অনেক ঘটনার কথা এই পরিবারটির অজানা থাকার কথা নয়। এসব জেনেশুনে ছেলে ফিরে আসবেন, এই আশা ধরে রাখতে কত মানসিক শক্তিই না লাগে!

তবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে দীর্ঘ সময় পরে ফিরে এসেছেন এমন কিছু ঘটনাও আছে। এই ঘটনাগুলো হয়তো ইকবালের পরিবারকে আশা দিয়েছে, অপেক্ষার সময়ে শক্তি জুগিয়েছে। ইকবালের পরিবার ভাগ্যবান, তারা শেষ পর্যন্ত তাদের ছেলেকে ফিরে পেয়েছে। এই ফিরে আসা হয়তো এখনো যাঁরা নিখোঁজ আছেন, সেই পরিবারগুলোর মনে আশা জোগাবে।

তবে ইকবাল মাহমুদ যে কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে অপহরণের শিকার হয়েছিলেন, তা সিসি ক্যামেরার ফুটেজের সূত্রে শুরুতেই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এমন অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁরা কীভাবে বা কখন নাই হয়ে গেলেন, তার কোনো ক্লুই নেই! দুই-তিন বছর ধরে যাঁরা নিখোঁজ রয়েছেন, সেই পরিবারগুলো কি এখনো তাদের সন্তান, বাবা বা স্বামীর দরজায় কড়া নাড়ার অপেক্ষায় আছেন? এ ধরনের অপেক্ষা আসলে কত দিন করা যায়? কত দিন আশা ধরে রাখা যায় কে জানে!

গত বছরের ১৫ অক্টোবর ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড় থেকে ‘অপহৃত’ হওয়ার পর গত বুধবার রাতে লক্ষ্মীপুরে নিজের বাড়িতে হাজির হতে পেরেছেন ইকবাল মাহমুদ। এ ধরনের অপহরণের পর যাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁদের কাছ থেকে আমরা খুব বেশি কিছু জানতে পারিনি বা পারি না।

তাঁদের সবার বক্তব্য প্রায় একই রকম। অপহৃত অবস্থায় চোখ বাঁধা থাকায় কারা তাঁদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল বা কোথায় রেখেছিল তা তাঁরা জানেন না। যাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁদের সাধারণত চোখ বাঁধা অবস্থাতেই কোথাও না কোথায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইকবাল মাহমুদের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।

ইকবালের বাবা এ কে এম নুরুল আলম বলেছেন, বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে একটি অটোরিকশায় করে বাসায় ফেরেন ইকবাল। এর আগে তাঁকে কে বা কারা একটি মাইক্রোবাসে করে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার নতুন গরুহাটা এলাকায় নামিয়ে দেয়। তখন ইকবালের চোখ বাঁধা ছিল।

সাত মাস আগে ইকবালকে অপহরণের পরও তাঁর চোখ বেঁধে ফেলা হয়েছিল। এই সাত মাস ইকবাল কোথায় ছিলেন, তা তাঁর জানা নেই। কারা তাঁকে অপহরণ করেছিল, সে সম্পর্কেও তাঁর কোনো ধারণা নেই।

গত সাত মাস ইকবাল কোথায় ছিলেন বা কারা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল, তা খুব স্বাভাবিকভাবেই এখন ইকবালের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর পরিবারের এটা না জানলেও চলবে। পরিবারের কাছে তাঁর ফিরে আসাটাই সব। কিন্তু একটি রাষ্ট্র বা সমাজের কাছেও কি তাঁর ফিরে আসাটাই সব? আমরাও কি এতেই সন্তুষ্ট থাকব যে ইকবাল ফিরে এসেছেন!

এত দিন তিনি কোথায় ছিলেন বা কারা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং ফিরিয়ে দিয়ে গেল অথবা এই ‘অপহরণের’ পেছনের উদ্দেশ্য কী, তা খুঁজে বের করার দায় কি কারও নেই? বা যাঁরা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের ব্যাপারেও কি কারও দায় নেই? এ ধরনের নিখোঁজ বা অপহরণের ক্ষেত্রে পরিবারের তরফে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অভিযোগের তদন্ত করবে কে? যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই?

আমরা দেখে আসছি এসব অভিযোগ অস্বীকার করাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য যথেষ্ট। তাদের আর কোনো দায় নেই। এসব ঘটনার সঙ্গে যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো যুক্ততা না থাকে, তবে কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটা খুঁজে বের করার দায়টিও যে তাদের, সেটা সম্ভবত তারা আর মনে করে না।

তা না হলে কারা এই অপহরণগুলো করছে বা কাদের হাতে লোকজন গায়েব হয়ে যাচ্ছে, তার একটা বিহিত হয়তো হতো। যারা এ ধরনের অপহরণের সঙ্গে যুক্ত, তাদের শক্তি-সামর্থ্য ধারণা করতে পারি। তারা কাউকে যেকোনো জায়গা থেকে তুলে নিয়ে যেতে পারে।

সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে মাসের পর মাস আটকে রাখার মতো সুরক্ষিত ঘরবাড়ি তাদের রয়েছে। তারা পুলিশের নানা চেকপোস্ট এড়িয়ে মাইক্রোবাসে দাপিয়ে বেড়াতে পারে! এবং তাদের হাতে কেউ কেউ গায়েবও হয়ে যেতে পারে! দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন তাদের খোঁজ পায় না, তখন নাগরিকদের অসহায়ত্ব বাড়তেই থাকে।

ইকবাল মাহমুদ হয়তো কপালগুণে ফিরেছেন, সবাই তো ফেরে না!

এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক। 

Loading...

You must be logged in to post a comment Login

মতামত

প্রতিদিনের সর্বশেষ সংবাদ পেতে

আপনার ই-মেইল দিন

Delivered by FeedBurner

[X]