০৮ এপ্রিল ২০১৭, শনিবার

উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘চোখেরবালি’ নিয়ে লিখেছিলাম গেল বছর । সেই লেখাটির পর ‘নৌকাডুবি’র উপর একটা লেখা শেষ হওয়ার আগেই খবর পেয়েছি কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের নৌকাডুবি হয়েছে । নিজের পরাজয় সম্পর্কে আঞ্জুম সুলতানা সীমা তার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিচ্ছু নেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাকে মনোনীত করেছিলেন। নৌকা প্রতীক আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।’

 

 

 

 

 

আসলে আমাদের রাজনীতির এই ট্র্যাডিশন খুব পুরানো, বহুদিন থেকেই সমানে চলছে। বড় নেতাদের বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে খুশি করে যে যার মতো আখের গোছানোর রাজনীতি আমাদের দেশে নতুন কিছু নয় । এইসব কাণ্ড অতীতে অনেক দলের নেতা-নেত্রীদের প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসলেও দলীয় নেতাদের হুঁশ  ফেরেনি।

 

 

 

 

আমি অনেক দিন ধরে খুব উদ্বিগ্নের সাথে লক্ষ করেছি, শুধু মধ্যবিত্ত  রাজনীতিবিদেরাই নন, এ দেশের মন্ত্রী-এমপিরাও যে কোনো বিষয়ে কাজ-কামের কথার চেয়ে তেলবাজিটাই বেশি করেন । শীর্ষ নেতৃত্বকে খুশি করতে নানা  স্তুতি আর বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন । এরা কি রাজনীতির সংজ্ঞা জানেন ? রাষ্ট্র বিষয়ক থিওরিগুলো ? তাহলে আর দেশে প্রশ্ন ফাঁস, সরকারি আমলাদের ঘুষ বাণিজ্য; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সোনার বাংলার চিন্তা করে কী লাভ আছে কোনো ?

 

 

 

 

আমার তো মনে হয় সবকিছুর আগে এইসব মূর্খদের ঠেখাতে হবে, যারা নিজেদের অযোগ্যতাকে ডাকতে দিনে ছয়বেলা মোসাহেবীতে ব্যস্ত থাকেন । লজ্জাহীনতা নেই, বুঝে না বুঝে ঠিক ঠিক করে, মাথা কাত করে সব মেনে নেওয়া মানুষগুলো একবারও কি ভাবে দেশের কথা? বঙ্গবন্ধু তো ভোগের রাজনীতি করেন নি । আওয়ামী লীগের নেতারা কোনো ভাষণে বা বক্তৃতায় নিজেদের কথা বলেন না।

 

 

 

 

তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কিংবা কাজের কথা বলার চেয়ে পুরো সময় প্রধানমন্ত্রীর বন্দনায় মত্ত থাকেন। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, এরা কি আসলে প্রশংসা করছেন নাকি কৌশলে আখের গোছাতে   নেমেছেন? এ জাতীয় মোসাহেবী এবং দল ও দলের কাজ বাদ দিয়ে প্রশংসার নামে কথা বলার ভেতর দিয়ে তারা যে অন্যায় করছেন, তার একটা বড় প্রমাণ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী ফলাফেল আওয়ামী লীগের ভরাডুবি । কিন্তু নৌকাডুবির এই সংকেত ধানের শীষে হাওয়া দিচ্ছে এ কথা কয়জন বুঝেন?

 

 

 

 

তবে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এবং সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফল কিছুটা হলেও ভাবিয়ে তুলেছে ক্ষমতাসীনদের। দুই নির্বাচনেই ভরাডুবি হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের। সুপ্রিমকোর্টে নির্বাচনে পরাজয়ের নেপথ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করা হলেও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের  নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাইকে দায়ী করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।  আসলে অন্য ব্যাপারও  আছে ।

 

 

 

 

খেলা হতে হয় সমানে সমানে । ব্যবধান বড় হলে খেলা জমে না । হার জিতেও কিছু যায় আসে না । আর্জেন্টিনা যদি অনেক দিন শুধু ভুটান আর মালদ্বীপের সঙ্গে  খেলতে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা তার  নিজের শক্তি সম্পর্কে কার্যত সঠিক ধারণাটি এক সময়  করতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক । তারপর হুট করে একদিন ব্রাজিলের সাথে খেলতে নামলে হেরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ।

 

 

 

 

সমানে সমানে পরস্পর খেলায় উভয়ই টেকনিক জানে, কৌশল বোঝে এবং একজন আরেকজনকে টপকে যায়। আর আমাদের দেশে শক্তিশালী বিরোধীদল এখন নেই । তাই আওয়ামী লীগ  এরশাদের সঙ্গে খেলে বা ওয়াক ওভার নিয়ে জয়ী ভাবে,  তখন যে কোনো শক্ত মোকাবেলায় সে হারবেই । এখন অনেকে বলবেন, সরকার লোকাল প্রশাসন বা স্থানীয় নির্বাচনে ছাড় দিয়ে বিএনপিকে আসলে জাতীয় নির্বাচনে আনতে চাইছে। এতে প্রলুব্ধ হয়ে তারা আসবে এবং  গো হারা হারবে। কিন্তু কিভাবে? যে মানুষগুলো এসব নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে তারা জাতীয় নির্বাচনে মত বদলাবে?

Loading...

 

 

 

 

 

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে জেলার দুই সংসদ সদস্যকে অভিযুক্ত করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এর আগে ২০১২ সালের কুসিক নির্বাচনেও আফজল খানকে হারিয়ে মেয়র পদে বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থী মনিরুল হক  সাক্কু। আফজল এবং বাহারের দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই কুমিল্লার রাজনীতিতে সর্বজনস্বীকৃত। যার রেশ এবারের নির্বাচনেও পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আসলে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমার পরাজয়ের কারণ কী?

 

 

 

 

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মনিরুল হক সাক্কু ১১ হাজার ৮৫ ভোট বেশি পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। সাক্কু পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট আর আওয়ামী লীগ মনোনীত সীমা পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট।  কুমিল্লার স্থানীয় নেতারা বলছেন, দলীয় প্রার্থী স্বচ্ছ ইমেজের হলেও তার পিতা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট আফজল খান ও বাহার উদ্দীনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণেই কুমিল্লায় ক্ষমতাসীন দলকে হারতে হয়েছে।

 

 

 

 

অভিযোগ রয়েছে, এবারের নির্বাচনে আফজল খানের মেয়ে সীমার পক্ষে বাহারের পরিবারের সদস্যরা প্রকাশ্যে কাজ করলেও গোপনে ঠিকই বিএনপি প্রার্থী সাক্কুর পক্ষে ছিল বাহারের আশীর্বাদ। এ ছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার সিংহভাগ ভোটকেন্দ্রে পরাজিত হয়েছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সীমা। কুসিক নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে নির্বাচনী প্রচারে সাবেক ছাত্রনেতাদের অধিক উপস্থিতিকেও দায়ী করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।

 

 

 

 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেই এমন কিছু সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এই নির্বাচনের পুরোটা সময় একটানা অনেক দিন কুমিল্লায় অবস্থান করেছেন। তাদের অনেকেই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার চেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার কাজে। এদের কারণে স্থানীয় নেতাকর্মীরা যেমন বিরক্ত হয়েছে তেমনটি কুমিল্লার ভোটারদের মাঝেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

 

 

 
আসল কথা হলো, আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ  দ্বন্দ্বের প্রভাবে ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নৌকার পরাজয়ের পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়হীনতা, ত্যাগী নেতাদের দিয়ে শক্তিশালী কেন্দ্র কমিটি গঠনে ব্যর্থতা, দলের ভেতরে থাকা শত্রুদের শনাক্ত করতে না পারা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এসবের মধ্যে অন্যতম । তবে কারা নির্বাচনের সময় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নিয়েছে,  কারা ব্যক্তিস্বার্থের কারণে দলকে বারবার বিপদের মুখে ঠেলে  দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে সেটা বের করতে না পারলে, সামনে এরকম অনেক কিছুই দেখতে হবে ।

 

 

 

 

পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি, আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করার উদ্দেশে সরকার সফল হলেও বিএনপি প্রার্থীর বিজয় দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে ভাবিয়ে তুলেছে। কুসিক নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য আন্তরিক ছিল। তবে তারা সরকারের কথামতো নয়, নির্বাচন কমিশনের কথামতো সার্বক্ষণিক তৎপরতা দেখিয়েছে।

 

 

 

 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ না নেওয়া বিএনপি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে এখন থেকেই ইতিবাচক অবস্থানে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে পরীক্ষামূলক হিসেবে নেয়। প্রতিবন্ধকতা মাথায় রেখেই আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় এখন থেকেই কৌশল ঠিক করছে বলেও জানা গেছে ।

 

 

 

 

শেষকথা হলো, উত্তম অধমের সাথে নিশ্চিন্তেই চলে । কিন্তু প্রকৃত গণত্রন্ত্র চর্চায় শক্তিশালী বিরোধী দল লাগে । নয়তো অধমের সাথে চলতে চলতে উত্তম একদিন তার শক্তি হারাবে । আর সেটাই তো স্বাভাবিক !

লেখক – গবেষক সদস্য, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ।

Loading...

খোলাকলামে প্রকাশিত লেখার লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত। এর সাথে কর্তৃপক্ষ কোন ভাবেই সংশ্লিষ্ট না।

Loading...

মতামত

প্রতিদিনের সর্বশেষ সংবাদ পেতে

আপনার ই-মেইল দিন

Delivered by FeedBurner

[X]